রোববার   ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০   ফাল্গুন ১০ ১৪২৬   ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

চট্টলার বার্তা
১৯

বাজারে যাওয়ার সময় এই দোয়া পড়বেন

ধর্ম ডেস্ক

প্রকাশিত: ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে যাওয়ার সময় পড়তেন। তিনি উম্মতকে বাজারে যাওয়ার দোয়াও শিখিয়ে দিয়েছেন। হাদিস শরিফে এসেছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে যাওয়ার সময় এই দোয়া পড়তেন, 

لااله الاالله وحده لاشريك له له الملك وله الحمد يحي ويميت وهو على كل شئ قدير

অর্থ: আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই। তিনি একক সত্তা। তার কোনো শরিক বা অংশীদার নাই। তারই জন্য সকল রাজত্ব। সমস্ত প্রশংসা তার। তিনি জীবন দান করেন এবং তিনিই প্রান হরন করেন। তিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, দারেমী)।

বাজারে গিয়ে আল্লাহ তায়ালাকে ভুল না: উল্লেখিত দোয়াটি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারের কাছাকাছি গিয়ে পড়তেন। এর মাধ্যমে তিনি (সা.) উম্মতের মাঝে এই অনভূতি জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন যে, আমি গোটা বিশ্বের স্রষ্টা ও মালিক আল্লাহ তায়ালার বান্দা। তিনি ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই। পৃথিবীতে যা কিছু হওয়ার, সেসব তার হুকুম ইচ্ছায় সঙ্ঘটিত হয়। 

বাজারে গিয়ে মানুষ সাধারণত উদাসীন ও অনুভূতি শূন্য হয়ে পড়ে। দুনিয়ার চাকচিক্য তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। তখন এই আশঙ্কা প্রবল হয়ে ওঠে যে, এই চাক চিক্যের ধোকায় পড়ে না জানি তার স্রষ্টা ও মালকে ভুলে যায়। তাই এই দোয়ার মাধ্যমে এই শিক্ষা দেয়া হচ্ছে যে, দুনিয়া আছে তার আপন জায়গায়। কিন্তু তুমি যে আল্লাহ তায়ালার বান্দা, দুনিয়ার মোহে পড়ে এ কথা ভুলে যেয়ো না কখনোই। এবং নিজের মালিক ও স্রষ্টার কোনো হুকুমের খেলাফ কর না ঘুনাক্ষরেও। তাই দুনিয়ার স্বাভাবিক জীবন যাপন কর। তবে কখনোই ধোঁকায় পড় না।

এই হলো দুনিয়ার বাস্তবতা: আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াকে বড় বিস্ময়কর রূপে বানিয়েছেন। এই দুনিয়া ছাড়া কেউ চলতেই পারে না। তাই দুনিয়ার প্রয়োজন রয়েছে সকলের। কেননা, মানুষের কাছে যদি টাকা পয়সা না থাকে, খাদ্যদ্রব্য না থাকে, পোশাক আশাক না থাকে, ঘর বাড়ি না থাকে, তা হলে সে কীভাবে বেঁচে থাকবে? কিন্তু এই দুনিয়া যদি মানুষের মন মানসে ছেয়ে থাকে, এই দুনিয়া যদি আল্লাহ তায়ালাকে ভুলিয়ে দেয়, তা হলে এর চেয়ে ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্নক কোনো জিনিস হতে পারে না। 

তাই একজন মুমিনকে খুব ভেবে চিন্তে, সতর্কতার সঙ্গে দুনিয়ায় পা ফেলতে হয়। তাকে মনে রাখতে হয়, এই দুনিয়ার প্রয়োজন আমার রয়েছে ঠিক। তবে একে মন মানসে বসতে দেয়া যাবে না। দুনিয়ার মহবক্ষত ভালবাসা অন্তরে জায়গা দেয়া যাবে ন। মুমিনকে মনে রাখতে হয়, এই দুনিয়া যেন আমাকে আল্লাহ তায়ালার স্মরণ হতে উদাসীন করতে না পারে। এসব বিষয়ে মুমিনকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে।

সাহাবায়ে কেরামের দুনিয়া: হজরত সাহাবায়ে কেরাম নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লমের নিকট থেকে এই শিক্ষাই পেয়েছেন। ফলে দুনিয়া তাদের পদতলে আছড়ে পড়ে পড়েছে। কায়সা কেসরার ধনভান্ডার তাদের ওপর উৎসর্গ করা হয়েছে। রোম ইরানের বিশাল সভ্যতা তারা জয় করতে পেরেছেন। তারা সেই সভ্যতার নগরে প্রবেশ করেছে। সেখানকার চাকচিক্য আর জৌলুশ দেখেছেন কিন্তু তারা সে সবের ধোকায় পড়েননি।

একটি শিক্ষাণীয় ঘটনা: সাহাবি হজরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদি. এর ঘটনা বর্ণিত আছে। একবার তিনি রোমের একটি শহর অবরোধ করে রেখেছিলেন। রোমানরা দুর্গের ফটক বন্ধ রেখে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। অবরোধ দীর্ঘ হচ্ছে দেখে নগরের গন্যমান্য লোকেরা একটা কূট চাল চালালেন। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন শহরের মূল ফটক মুসলমানদের জন্য খুলে দেবে, যাতে তারা ভেতরে প্রবেশ করার সুযোগ পায়।

শহরে প্রবেশ করে তারা দেখতে পাবে জমকাল সব আয়োজন। রাস্তার উভয় পাশে সোনা দানা মনি মানিক্য দিয়ে সাজিয়ে রাখা হলো সারি সারি দোকান। প্রত্যেক দোকানে বসিয়ে রাখা হলো একজন করে অপরূপ সুন্দরী নারীকে। আরো সব চোখ ধাধানো আয়োজন তারা করে রাখল। তারা ভেবেছিল দীর্ঘদিন যাবত ঘর ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এই মরুবাসি আরবেরা নিতান্ত অসহায় ও হতদরিদ্র। তারা শহরে প্রবেশ করে যখন এসব জাকজমকপূর্ণ দোকানগুলো দেখবে এবং যখন দেখবে সুন্দরী নারীরা সেজে গুজে বসে আছে তখন তারা নিঃসন্দেহে সেদিকে ঝাপিয়ে পড়বে। এই সুযোগে আমরা তাদের ওপর পেছন থেকে হামলা করে বসব এবং তাদেরকে পরাস্ত করে দেব।

অন্যদিকে তারা সেই সুন্দরী নারীদেরকে বলে দিয়েছে, যাযাবর আরবেরা যখন তোমাদের প্রতি হাত বাড়াবে তখন তোমরা কিন্তু না বল না। সুতরাং তারা হজরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদি. এর নিকট এই সব মর্মে বার্তা পাঠাল, যে আমরা আপনাদের জন্য শহরের প্রধান ফটক খুলে দিয়েছি। অতএব আপনি আপনার বাহিনী নিয়ে শহরে আসতে পারেন। এই সংবাদ শুনে হজরত আবু উবায়দা রাদি. সবাইকে জানিয়ে দিলেন যে, তোমাদের জন্য শহরের ফটক খুলে দেয়া হয়েছে। 

সুতরাং তোমরা সবাই শহরে ঢুকে পড়। তবে আমি তোমাদের সামনে কোরআনুল কারিমের এক খানা আয়াত তেলাওয়াত করছি। শহরে প্রবেশ ও থাকা কালে আয়াতটি মনে রাখবে। এবং এর ওপর আমল করবে। তারপর তিনি এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন, 

قل للمؤمنين يغضوا من ابصا رهم ويحفظون فروجهم

‘আপনি মুমিনদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নিচু করে রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে।’ (সূরা: নুর, আয়াত, ৩০)।

ঐতিহাসিকগন লিখেছেন, হজরত আবু উবায়দা রাদি. এর বাহিনী সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বাজারের ওপর দিয়ে চলে যায়। কিন্তু তাদের কেউই ডানে বামে তাকালেন না। এমনকি এভাবে তারা শহরে বিজয়ের পতাকা এড়াতে সক্ষম হন।

শহরবাসী এই বিস্ময়কর ও অভিনব দৃশ্য দেখে ভাবতে লাগল, এরা এমন সম্প্রদায়, যারা বিজয়ীর বেশে শহরে প্রবেশ করেছে। কিন্তু এরপরও শহরের পণ্যবোজাই দোকানপাট এবং সুন্দরী রুপসী নারীদের প্রতি চোখ তুলে তাকায়নি। অথচ, শহরময় ছড়িয়ে পড়েছে তারা, তাদের আচরণ দেখে স্থানীয় লোকজন নিশ্চিত হয়ে গেল, অবশ্যই এরা আল্লাহ তায়ালার খাস বান্দা। শুধু এতটুকু নয়, শহরের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান হয়ে গেলে। এবং লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর আওয়াজ তুলল।

দুনিয়ায় থেকে আল্লাহকে ভুল না: আল্লাহ তায়ালা এবং তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে এভাবে শিক্ষা দিয়েছেন যে, যত বড় রাজ রাজাড়া আসুক, যত সৌন্দর্য তাদের সামনে সাজিয়ে রাখা হোক, সব সময় তাদের অন্তর আল্লাহ তায়ালার প্রতি নিবিষ্ট থাকত। আখেরাতের চিন্তায় তারা বিভোর থাকতেন। একারণে দুনিয়া তাদেরকে ধোঁকা দিতে পারেনি। 

উম্মতের প্রতি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা হলো, তোমরা দুনিয়ায় থাক। দুনিয়া দারি কর। বাজারে যাও। কিন্তু আল্লাহ তায়ালাকে ভুল না। মরহুম আকবর এলাহাবাদী সুন্দর বলেছেন, সোচ্ছাসে কলেজে পড়। পার্কে যাও। বাতাসে চড়ে আকাশে ওড়। যা খুশি কর। তবু আমার একটি কথা শোন। আল্লাহ তায়ালাকে ভুলে যেও না। ভুল না আত্মমর্যাদা। যেখানে মন চায় যাও। কিন্তু আল্লাহ তায়ালাকে ভুল না । বাস্তবতা ভুলে থেক না। একারণে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে যাওয়ার সময় প্রত্যেক মুসলমানকে এই দোয়া পড়তে বলেছেন। যে ব্যক্তি বাজারে যাওয়ার সময় এই দোয়া পড়বে ইনশা আল্লাহ বাজারের চাকচিক্য ও ঝলমলানী তাকে আল্লাহ তায়ালার ব্যাপারে গাফেল ও উদাসীন করতে পারবে না।

বেচাকেনার দোয়া: বাজারে গিয়ে কোনো কিছু ক্রয় কিংবা বিক্রয়ের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দোয়া পড়তেন,

اللهم انى اعوذ بك من صفقة خاسرة ويمين فاجر

‘আয় আল্লাহ ক্ষতিকর ব্যবসায় ও মিথ্যা কসম থেকে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’ (কানযুল উম্মাল, ৮৭/২৮৪/ হাকিম ১/৩৯, মাজমাউয যাওয়ায়েদ ২/৭৪)।

বেচাকেনার মধ্যে কখনো লাভ হয়। কখনো বা লোকসান হয়। ব্যবসায়ীরা প্রায় সময় মিথ্যা কসম খায়। এ কারণে প্রার্থনা করা হয়েছে, আয় আল্লাহ, আমি ক্ষতিকর কেনা কাটা থেকে আপনার আশ্রয় কামনা করছি এবং আপনার আশ্রয় প্রর্থনা করছি, মিথ্যা কসম থেকে। যাতে করে ক্ষতিকর বেচাকেনা ও মিথ্যা কসম থেকে বেচে থাকতে পারি।

এমন ব্যক্তি ব্যর্থ হতে পারে না: যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার নামে ঘর থেকে বের হয়। আল্লাহ তায়ালার সাহয্য প্রার্থনা করে এবং তারই ওপর ভরসা করে ঘর থেকে বাইরে বের হয়। আল্লাহ তায়ালার শক্তি সামর্থ্যের কথা স্বীকার করে ঘর থেকে বের হয়, আল্লাহ তায়ালার তাওহিদ ও একত্ব স্বীকার করে বাজারে যায়। নিজের সকল প্রয়োজন আল্লাহ তায়ালার নিকট পেশ করে এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা কখনোই ব্যর্থ ও অসফল করতে পারেন না।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে এসব দোয়ার ওপর আমল করার এবং এর হাকিকত ও তাৎপর্য বোঝার তাওফিক দান করুন। আমিন।

চট্টলার বার্তা
চট্টলার বার্তা
এই বিভাগের আরো খবর