বুধবার   ১৩ নভেম্বর ২০১৯   কার্তিক ২৯ ১৪২৬   ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

চট্টলার বার্তা
২৩

ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসবের লাইন আপ

বিনোদন ডেস্ক:

প্রকাশিত: ৩ নভেম্বর ২০১৯  

বাংলার মাটি, রূপ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অবিরাম ঢেউ খেলে যায় লোকজ সুরের মোহনা। যেখানে খুঁজে পাওয়া যায় বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস। যে ইতিহাসের পরতে পরতে গেঁথে আছে বাংলা লোকগানের বৈচিত্রময় সুর ও সঙ্গীত। যার সুর, তাল, লয় ও ছন্দের বর্ণিল ছোঁয়ায় সঙ্গীতপ্রিয় সমস্ত মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে পারার এক ঐশ্বরিক ক্ষমতা রয়েছে। কেননা এই লোকসঙ্গীতের মধ্যদিয়েই খুঁজে পাওয়া যায় আত্মার শান্তি ও ঐতিহ্যের সমৃদ্ধি। বাঙালির নিজস্ব সম্পদ বাংলা লোকসঙ্গীতকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়া এবং সারাবিশ্বে লোকসঙ্গীতের গৌরবময় সুদৃঢ় অবস্থান তৈরির লক্ষ্য নিয়ে টানা পঞ্চমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় লোকসঙ্গীতের উৎসব- আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসব (ফোকফেষ্ট-২০১৯)। 

সান কমিউনিকেশন্স এবং সান ফাউন্ডেশন- এর উদ্যোগে এবারো রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে তিন দিনের এই উৎসব আয়োজন করা হয়েছে। উৎসবের উদ্বোধন হবে আগামী ১৪ নভেম্বর, চলবে ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত।

এবারের আসরে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ছয়টি দেশ থেকে ২০০ জনেরও বেশি লোকসঙ্গীতশিল্পী ও কলাকুশলী অংশ নেবেন। প্রতিবারের মতো অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে দর্শক ফোক ফেস্টে অংশ নিতে পারবেন। আগামী ৬ নভেম্বর শুরু হয়ে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধন প্রক্রিয়া চলবে।

পঞ্চমবারের আসরে দর্শকেরা উপভোগ করতে পারবেন দেশ-বিদেশের নামজাদা লোকসঙ্গীত শিল্পীর শিকড়সন্ধানী গান। তিন দিনের এ আয়োজনের প্রথম দিন গান গাইবেন প্রখ্যাত বাউলশিল্পী শাহ আলম সরকার, ভারতের দালের মেহেন্দি ও জর্জিয়ার শেভেনেবুরেবি। এ ছাড়া নৃত্য পরিবেশন করবে প্রেমা ও ভাবনা নৃত্য দল। প্রথম দিনের শিল্পীদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো-

শাহ আলম সরকার

বাংলা বাউল গানের এক অনন্য শিল্পী, গীতিকার ও সুরকারের নাম শাহ আলম সরকার। পারিবারিকভাবেই তিনি বাউল গানের সঙ্গে যুক্ত। সঙ্গীত জীবনে তার ৬৫০টিরও বেশি অ্যালবাম বের হয়েছে। তার লেখা ও সুর করা অসংখ্য গানে কণ্ঠে দিয়েছেন গুণী শিল্পী মমতাজ বেগম। শাহ আলম সরকার বিভিন্ন আসরে পালাগান পরিবেশন করে থাকেন। 

দালের মেহেন্দি (ভারত)

দালের মেহেন্দির জন্ম ১৯৬৭ সালে বিহারের পাটনায়। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে পাঞ্জাবি ভাঙড়া গান দিয়ে সারা ভারত জুড়ে ঝড় তোলেন তিনি। ১৯৯৫ সালে তার প্রথম অ্যালবাম ‘বোলো তা রা রা রা...’ প্রায় ২০ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়। প্রায় তিন দশকের ক্যারিয়ারে শ্রোতাদের অসংখ্য হিট গান উপহার দিয়েছেন, সুখ্যাতি পেয়েছেন বলিউডে প্লেব্যাক করেও। ‘দ্য কিং অব ভাঙড়া ’ দালের মেহেন্দির কণ্ঠে পাঞ্জাবি ভাঙড়া গান সীমানা পেরিয়ে সারাবিশ্বে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

শেভেনেবুরেবি (জর্জিয়া)

জর্জিয়ান ফোক ব্যান্ড শেভেনেবুরেবি যাত্রা শুরু করে ২০০১ সালে। বিভিন্ন ধরনের ফোক ইন্সট্রুমেন্টের সমন্বয়ে ভিন্নধর্মী সঙ্গীতায়োজন তাদের গানের প্রধান বৈশিষ্ট্য। গান গাওয়ার পাশাপাশি ব্যান্ডটি জর্জিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ফোক গান সংগ্রহ করে থাকে। শেভেনেবুরেবি জর্জিয়ান ফোক সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে। ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বড় বড় কনসার্টে গান করেছে তারা।

প্রেমা ও ভাবনা নৃত্য দল

নাচের ভুবনে ২০০৭ সালে শুদ্ধ নৃত্য চর্চায় বিশ্বাসী ‘ভাবনা নৃত্যদলের’ আগমন। বাংলাদেশের জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার শামীমা হোসাইন প্রেমার হাত ধরে এই নৃত্যদলের যাত্রা শুরু। প্রথম থেকেই ভাবনা নৃত্যদল বিভিন্ন নৃত্য আঙ্গিকের মাধ্যমে নজরুল ও রবীন্দ্রনাথকে মঞ্চে নিয়ে আসতে চায়। এছাড়াও ভাবনা নৃত্যদল বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য, রাঁয়বেশে এবং আধুনিক ধারার নাচ পরিবেশন করে থাকে। এরইমধ্যে তারা ‘ভানুসিংহের পদাবলি’, ‘শকুন্তলা’, ‘পাপমোচন’ প্রভৃতি পরিবেশন করেছে।

ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসব-২০১৯ এর দ্বিতীয় দিন সুরের মূর্ছনায় ভাসাবেন বাংলাদেশের মালেক কাওয়াল, ফকির শাহাবুদ্দিন, ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’র কামরুজ্জামান রাব্বি ও শফিকুল ইসলাম, পাকিস্তানের হিনা নাসরুল্লাহ এবং মালির হাবিব কইটে অ্যান্ড বামাদা। এবারে তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো- 

মালেক কাওয়াল

মালেক কাওয়াল বাংলা লোকসঙ্গীতের এক অনন্য নাম। চার দশকের বেশি সময় ধরে কাওয়ালী গান গেয়ে আসছেন তিনি। মালেক কাওয়ালের গানে হাতেখড়ি গুরু মহীন কাওয়ালের কাছে। পরবর্তীতে তিনি ওস্তাদ মরহুম টুনু কাওয়ালের কাছে তালিম নিয়েছেন। কাওয়ালী গানের পাশাপাশি তিনি মাইজভান্ডারি গানেও পারদর্শী। 

ফকির শাহাবুদ্দিন

বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত, বাউল ও সুফি গানের জনপ্রিয় শিল্পী ফকির শাহাবুদ্দিন। পাশাপাশি তিনি একজন গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত গবেষক। লোকগানের কিংবদন্তী শাহ আবদুল করিমের সান্নিধ্যে আসার পর বাউল গানের দিকে ঝুঁকে পড়েন ফকির শাহাবুদ্দিন। তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাউল সঙ্গীতের সঙ্গে জড়িত তিনি। এ পর্যন্ত ৭টি একক অ্যালবাম এবং বেশ কয়েকটি যৌথ অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে তার। ফকির শাহাবুদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে বাউল গান নিয়ে গবেষণা করছেন, গ্রামে গ্রামে ঘুরে সংগ্রহ করেছেন প্রায় চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ হাজার বাউল গান। 

কামরুজ্জামান রাব্বি

বর্তমান সময়ের বাংলা লোকগানের একটি জনপ্রিয় নাম কামরুজ্জামান রাব্বি। দোতারা বাজিয়ে লোকগান গেয়ে এই শিল্পী খুব অল্প সময়েই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। চাচা আবদুল জলিলের কাছ থেকে দোতারা বাজানো শেখেন রাব্বি। গান শেখেন রাজশাহীতে, ওস্তাদ নিজামুল ইসলাম খানের কাছে। ২০১৬ সালে বাউল গানের রিয়ালিটি শো ‘বাউলিয়ানা’র মঞ্চে সর্বপ্রথম নজর কাড়েন রাব্বি। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের একজন তালিকাভুক্ত শিল্পী।

শফিকুল ইসলাম

মাটির গান গেয়ে কৈশোরেই শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে শফিকুল ইসলাম। ২০১৬ সালে আয়োজিত ‘বাউলিয়ানা’য় প্রথম রানারআপ হয়ে আলোচনায় আসে শফিকুল। এরপর চলতি বছরে আয়োজিত গানের রিয়্যালিটি শো ‘গানের রাজা’য় অংশ নিয়েও নতুন করে আলোচনায় আসেন। মূলত বাউল ও বিচ্ছেদি গান করলেও সব ধরনের গানেই পারদর্শিতা রয়েছে এই ক্ষুদে শিল্পীর। ময়মনসিংহের ছেলে শফিকুল এখন গান গাইছে দেশের বড় বড় সব মঞ্চে।

হিনা নাসরুল্লাহ (পাকিস্তান)

সুরেলা কণ্ঠের জন্য সুপরিচিত হিনা নাসরুল্লাহ। পাকিস্তানের এ শিল্পী মূলত সুফী ঘরানার গান করেন। খুব ছোটবেলায় পাকিস্তানি টেলিভিশনে হামদ ও না’ত পরিবেশনার মাধ্যমে তার সঙ্গীত জীবনের শুরু। বিশ্বের নানা প্রান্তে সুফী কনসার্টে সুরের মূর্ছনায় শ্রোতাদের মাতিয়ে রেখেছেন তিনি। তিনি উর্দুর পাশাপাশি সিন্ধি এবং সারাইকি ভাষায়ও গান করে থাকেন।

হাবিব কইটে অ্যান্ড বামাদা (মালি)

মালিয়ান লোকসঙ্গীতের জীবন্ত কিংবদন্তী হাবিব কইটে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তার প্রথম অ্যালবাম ‘মুসো কো’ দিয়ে সারাবিশ্বে সঙ্গীতপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে ভিন্নধর্মী গিটারবাদন এবং গায়কী দিয়ে শ্রোতাদের মাতিয়ে রেখেছেন। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি নিজের ব্যান্ড বামাদাকে নিয়ে প্রায় ১৭শ কনসার্টে গান করেছেন, পারফর্ম করেছেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় মঞ্চে। 

এবারের লোকসঙ্গীত উৎসবের শেষ দিনে শ্রোতা-দর্শকদের সুরের মোহনায় ভাসাবেন বাংলাদেশের কাজল দেওয়ান, চন্দনা মজুমদার, পাকিস্তানের জুনুন এবং রাশিয়ার সাত্তুমা। সমাপনী দিনের শিল্পীদেরে সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো- 

কাজল দেওয়ান

বাউলশিল্পী কাজল দেওয়ানের জন্ম ১৯৬৮ সালে ঢাকার কেরানীগঞ্জে। ছোটবেলায় বাবা-মার সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গানে হাতেখড়ি। বাবা প্রখ্যাত বাউল মাতাল কবি আব্দুর রাজ্জাক দেওয়ানের হাত ধরে নিজেকে বাউল গানের সুরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেন কাজল দেওয়ান। তার ঝুলিতে রয়েছে প্রায় তিনশ’র মতো অডিও অ্যালবাম। 

চন্দনা মজুমদার

চন্দনা মজুমদার মূলত লালন সঙ্গীত শিল্পী। কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর পাড়ে জন্ম এই গুণী শিল্পীর। বাবা নির্মলচন্দ্র মজুমদার লালনগীতির শিল্পী হলেও তিনি চেয়েছিলেন নজরুলগীতি করুক চন্দনা। কিন্তু কুষ্টিয়া এলাকা এবং পারিবারিক পরিবেশ তাকে নিয়ে আসে লালনের সুরে। লালনের বাইরে রাধারমণ, হাসন রাজা, শাহ্ আবদুল করিমসহ বিভিন্ন গীতিকবির গান করেন তিনি। ২০০৯ সালে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। প্রখ্যাত বাউল গানের শিল্পী কিরণ চন্দ্র রায় তার সহধর্মী।

জুনুন (পাকিস্তান)

উপমহাদেশের সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে ‘জুনুন’ এক উন্মাদনার নাম। পাকিস্তানি এই ব্যান্ডটি সুফি ঘরানার গান দিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে শ্রোতাদের মোহাবিষ্ট করে রেখেছে। ১৯৯৭ সালে নিজেদের চতুর্থ অ্যালবাম ‘আজাদি’ দিয়ে সারা উপমহাদেশে ঝড় তোলে জুনুন। অ্যালবামের প্রথম গান ‘সাইওনি’ পাকিস্তান, ভারত এবং বাংলাদেশ- তিন দেশের শ্রোতাদের কাছেই তুমূল জনপ্রিয়তা পায়। সারাবিশ্বে ‘জুনুন’-র ত্রিশ মিলিয়নেরও বেশি অ্যালবাম বিক্রি হয়েছে।

সাত্তুমা (রাশিয়া)

সাত্তুমা রাশিয়ান কারেলিয়া অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যান্ডগুলোর মধ্যে একটি। পারিবারিক এই ব্যান্ডটির যাত্রা শুরু ২০০৩ সালে। নিও ফোক ঘরানার গান নিয়ে সাত্তুমা ট্যুর করেছে ইউরোপের নানা প্রান্তে। মঞ্চে নানা ধরনের ইন্সট্রুমেন্ট বাজিয়ে এক অদ্ভুত মূর্ছনায় দর্শককে আবিষ্ট করে রাখেন সাত্তুমার সদস্যরা। রাশিয়া, আমেরিকা, ফিনল্যান্ড, স্ক্যান্ডিনেভিয়া, এস্তোনিয়া এবং জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের গান দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন তারা।

চট্টলার বার্তা
চট্টলার বার্তা
এই বিভাগের আরো খবর