রোববার   ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০   ফাল্গুন ১০ ১৪২৬   ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

চট্টলার বার্তা
২২৭

চট্টগ্রামের সুদর্শন তবলা বাজিয়ে ৪বার গিনেস বুকে নাম উঠালেন

প্রকাশিত: ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

বিশ্ব দরবারে বাঙালি সংস্কৃতি তুলে ধরতে একটানা ৫৫৭ ঘণ্টা ১১ মিনিট তবলা বাজিয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড বুকের নতুন রেকর্ড গড়েন চট্টগ্রামের ছেলে সুদর্শন দাস। 

এর আগে অনেকগুলো জনপ্রিয় গানের তালে তবলা বাজিয়ে বিশ্ব  রেকর্ড গড়েছেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী তবলাবিশারদ সুদর্শন দাস। ২০১৭ সালে টানা ২৭ ঘণ্টা ঢোল বাজিয়ে আরেকটি গিনেস রেকর্ড করেন। ২০১৮ সালে টানা ১৪ ঘণ্টা ড্রাম রোল বাজান সুদর্শন। এটি তার তৃতীয় গিনেস রেকর্ড।

সর্বশেষ ২০১৯ সালে একটানা ১৪০ ঘণ্টা ৫ মিনিট ড্রাম সেট বাজিয়ে সর্বশেষ গিনেস ওয়ার্ল্ড বুক রেকর্ডের অধিকারী হন। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার অমূল্য রঞ্জন দাস ও বুলবুল রানী দাসের সন্তান সুদর্শন দাস ৪ বছর বয়সে চট্টগ্রামের আলাউদ্দিন ললিতকলা একাডেমিতে তবলায় হাতেখড়ি নেন। 

১৯৯১ সালে আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক জেতেন সুদর্শন। ১৯৯২ সালে ভারতের শান্তিনিকেতনে পন্ডিত বিজন চ্যাটার্জির কাছে তবলা বিষয়ে তালিম নেন তিনি। ১৯৯৮ সালে ভারতের বোলপুরের শান্তি নিকেতন থেকে সুদর্শন দাসকে তবলা বিশারদ উপাধি দেওয়া হয়। 

পরে ২০০৪ সালে যুক্তরাজ্যে আইন পেশায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিলেও সুদর্শনের মন পড়ে থাকে তবলার প্রতি। লন্ডনে প্রতিষ্ঠা করেন ‘তবলা ও ঢোল’ একাডেমি। ২০০৮ সালে ভারতের বেঙ্গালুরুতে আন্তর্জাতিক তবলা প্রতিযোগিতায় রৌপ্য পদক জেতেন তিনি। চার ভাইয়ের মধ্যে চতুর্থ সুদর্শন। বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলেকে ব্যারিস্টার হতে হবে। 

সুদর্শন বলেন, ‘অন্য তিন ভাই প্রকৌশলী, চিকিৎসক ও কম্পিউটার নিয়ে পড়েছেন। তাই আমাকে ব্যারিস্টার হওয়ার তাগিদ দিতে থাকেন।’ যুক্তরাজ্যে ইউনিভার্সিটি অব গ্রিনিচে গ্র্যাজুয়েশন করার পর ২০০৭ সালে নর্দাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করেন। এর আগে আইনের পাশাপাশি ২০০৫ সালে সংগীত নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা শুরু করেন সেখানে। ২০১০ সালে তিনি বার অ্যাট ল পাস করেন। প্রথমদিকে ব্রিটেনে খরচ জোগাতে দিনে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিভিন্ন দোকানে কাজ করেন সুদর্শন। কষ্টের জীবন। তবু তিনি তবলা ভোলেননি। 

‘একদিন কৃষ্ণাদি নামে একজন আমাকে বললেন, তুমি তো তবলা বাজাতে পার। নেহরু সেন্টারে একটা অনুষ্ঠানে বাজালে আমি ব্যবস্থা করে দেব। আমি রাজি হয়ে যাই। এরপর আমার তবলা সবার ভালো লাগল। পরে আমাকে তাদের একটা বিদ্যালয়ে (প্রতিবন্ধীদের) তবলা শেখানোর জন্য নিয়োগের প্রস্তাব দিল। প্রথমে তিন ঘণ্টা। পরে তা ফুলটাইম করা হয়।’ সুদর্শন বললেন। 

ভারতের কুজলমান্নাম রামকৃষ্ণান নামের এক ব্যক্তি ৫০১ ঘণ্টা মৃদঙ্গ বাজিয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়ার বিষয়টি সুদর্শন জানতে পারেন ২০০৯ সালে। সেই থেকে স্বপ্ন দেখা শুরু। গিনেস কর্তৃপক্ষ জানায় বিশ্বরেকর্ড গড়তে হলে একটানা ৫০১ ঘণ্টার বেশি সময় তবলা বাজাতে হবে সুদর্শনকে। সেই যাত্রায় আর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আবারও ৩ বছর পর চেষ্টা করলেন সুদর্শন। 

কয়েকদিন পরীক্ষামূলকভাবে তবলা বাজিয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড কর্তৃপক্ষকে পাঠালেন তিনি, মনোনীত হলেন না সুদর্শন। ২০১৬ সালে একসঙ্গে ১৫ দিন টানা তবলা বাজানোর ট্রায়াল পাঠালে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হন সুদর্শন। মোট ১১ জন প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হলেও বাকি ১০ জনকে বাদ দিয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড কর্তৃপক্ষ ২০১৬ সালের ১ আগস্ট সুদর্শন দাসকেই বিশ্ব রেকর্ড ভাঙার উদ্যোগ নিতে আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেয়। 

জানা যায়, ‘টানা ২৫ দিন তবলা বাজাতে গিয়ে সুদর্শন দাসকে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড কর্তৃপক্ষের বেঁধে দেওয়া নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি সিসি টিভির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করেছে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড কর্তৃপক্ষ। ক্যামেরায় ধারণ করা ৫৫৭ ঘণ্টার ভিডিও রেকর্ড জমা দিতে হবে গিনেস কর্তৃপক্ষকে। 

এ ছাড়াও প্রতি ঘণ্টায় ৫ মিনিট ও ২৪ ঘণ্টায় মোট ২ ঘণ্টা বিরতি নিতে পেরেছেন তিনি।’ পন্ডিত সুদর্শন তার বর্তমান ব্যস্ততা নিয়ে লন্ডন থেকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এ প্রতিবেদককে। তিনি জানিয়েছেন বাংলাদেশে আগামী আগস্ট থেকে ‘অর্জন একাত্তর’ নামে একটি চলচ্চিত্রে মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করার কথা রয়েছে। 

সিনেমাটি পরিচালনা করবেন মির্জা শাখাওয়াত। এতে মৌসুমী, শতাব্দী ওয়াদুদ প্রমুখ অভিনয় করবেন।  লন্ডনে নিউহাম বরায় প্রশিক্ষক হিসেবে তিনি স্কুলে সংগীতের পাঠদান বিষয়টি তদারকি করেন। এ ছাড়াও তার নিজস্ব তবলা অ্যান্ড ঢোল অ্যাকাডেমি নামে সংগীতশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেখানে তবলা, মিউজিক শেখানো হয়। ভারত, পাকিস্তান, আফ্রিকানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের এখানে সংগীত শেখানো হয়। 

অটিস্টিক শিশুদেরও বিনামূল্যে সংগীত শেখান তিনি। চলতি বছরের জুনের দিকে ব্রিটিশ রানীর মিউজিক ফ্যাস্টিভ্যালে (মে-জুন) ৪টি ইন্সট্রুমেন্ট বাজানোর কথা রয়েছে তার। তবলা শেখার ওপর বাজারে তার ২টি ডিভিডি পাওয়া যায়। একমাত্র ব্রিটিশ বাংলাদেশি হিসেবে তার এসব ডিভিডি রয়েছে। এ বছর তৃতীয়টি আসছে বলে জানান তিনি। 

পন্ডিত সুদর্শন অনলাইনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সংগীত শেখান। এ বছর মুজিববর্ষ উপলক্ষে আবার নিজের রেকর্ড ভঙ্গ করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। মুজিববর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশে ১০০০ ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে মিউজিক ফ্যাস্টিভ্যাল করার ইচ্ছা রয়েছে তার। এটিও তার ব্যক্তিগত এবং বাংলাদেশের জন্য গিনেস রেকর্ড হবে।  

ইতিমধ্যে ১৭টি দেশ ভ্রমণ করে ওয়ার্কশপ করানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। বিশ্বের ৫টি দেশে তার সংগীত অ্যাকাডেমি আছে। এ বছর ভারতে দ্বিতীয় শাখা খুলবেন বলে জানান তিনি। প্রসঙ্গত, পন্ডিত সুদর্শন ২০০০ সাল থেকে লন্ডনে বসবাস করছেন। বর্তমানে গিনেস ওয়ার্ল্ড ট্যুর দলের সঙ্গে কাজ করছেন তিনি। যার অংশ হিসেবে সম্প্রতি বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন এ তবলাবিশারদ।    

চট্টলার বার্তা
চট্টলার বার্তা
এই বিভাগের আরো খবর